বিরল রোগে জটিল ওপেন হার্ট সার্জারি: জীবন বাঁচালেন বাংলাদেশি সার্জনরা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত August 23, 2026, 19:39 PM
রিপোর্ট: নাসিম আনোয়ার : বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা যখন ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে এবং উচ্চবিত্ত ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সামান্য শারীরিক জটিলতাতেও বিদেশমুখী হচ্ছেন, ঠিক সেই সময়ে দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের এক ভিন্ন চিত্র ফুটে উঠেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানসহ একাধিক জটিল রোগীর দেশে সফল বাইপাস ও ওপেন হার্ট সার্জারি দেশীয় চিকিৎসকদের ওপর মানুষের আস্থা পুনর্গঠনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশে না গিয়ে দেশের মাটিতে দেশীয় সার্জনদের মাধ্যমে সফল চিকিৎসা গ্রহণ কেবল ব্যক্তিবিশেষের সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি ইতিবাচক বার্তার নির্দেশক। ডা. শফিকুর রহমানের অস্ত্রোপচারটি পরিচালনা করেন খ্যাতনামা কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির ও তাঁর দল।
তবে এটি কেবল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ নয়। দেশে বিরল ও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ শারীরিক জটিলতায় আক্রান্ত সাধারণ রোগীরাও এখন দেশীয় চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে সুস্থ জীবন ফিরে পাচ্ছেন।
কংজেনিটাল মায়াস্থেনিয়া সিন্ড্রোম (Congenital Myasthenia Syndrome) ও মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিসের মতো বিরল স্নায়ুরোগে আক্রান্ত একাধিক জটিল রোগীর সফল হৃদরোগের অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে সম্প্রতি। এরকমই এক জটিল পরিস্থিতিতে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হয়ে জাতীয় নিউরো সায়েন্স ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের যৌথ সহযোগিতায় কার্ডিয়াক সার্জন অধ্যাপক ডা. সঞ্জয় কুমার রাহার নেতৃত্বে গঠিত বিশেষজ্ঞ দল এক রোগীর সফল ওপেন হার্ট সার্জারি সম্পন্ন করে।
চিকিৎসকদের মতে, মায়াস্থেনিয়া গ্র্যাভিস বা মারফান সিন্ড্রোমের (Marfan Syndrome) মতো জিনগত ও স্নায়বিক জটিলতায় আক্রান্ত রোগীদের ওপেন হার্ট সার্জারি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পেশীর দুর্বলতা, রক্তনালী ও মহাধমনীর (Aorta) ক্ষতি কিংবা এওটিক ভাল্ব অকেজো হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে একাধিক বিভাগের সমন্বিত চিকিৎসা ছাড়া অস্ত্রোপচার সম্ভব নয়।
বিগত কয়েক বছরে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন বিশেষায়িত সেন্টারে অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর কবির, ডা. এ কে এম মঞ্জুরুল আলম, ডা. সঞ্জয় কুমার রাহা, ডা. কামরুল আহসান ও ডা. জাকির খালেদের মতো সার্জনরা জটিল এওটিক ভাল্ব ও ভাস্কুলার সার্জারিতে সাফল্য দেখিয়েছেন।
স্বাস্থ্য খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, বেসরকারি খাতের বেশ কিছু বিশেষায়িত হাসপাতালে উন্নত অবকাঠামো ও বিশ্বমানের প্রযুক্তি যুক্ত হওয়ায় জটিল নিউরো ও কার্ডিয়াক সার্জারি এখন নিয়মিত ঘটনা। তবে এই ইতিবাচক চিত্রের বিপরীতে সরকারি হাসপাতালগুলোর চিত্র এখনো বেশ অপ্রতুল। প্রশাসনিক জটিলতা, অনিয়ম, ওষুধ ও খাদ্য বরাদ্দে কারচুপি এবং স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণে প্রতিনিয়ত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দক্ষ চিকিৎসকরা সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও এই প্রশাসনিক ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কার্ডিয়াক ও নিউরো সার্জারিতে দেশীয় চিকিৎসকদের সাফল্য নির্দেশ করে যে বাংলাদেশে মেধার ঘাটতি নেই। তবে সরকারি হাসপাতালে সিন্ডিকেট ও দুর্নীতি রোধ করে সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা না গেলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী এই উন্নত সেবার সুফল থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে।